দৈনিক চাঁপাই চিত্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ৪ জানুয়ারি ২০১৬
৩০ ডিসেম্বর সারা দেশের ন্যায় নাচোলেও অনুষ্ঠিত হয় পৌরসভা নির্বাচন। এবার ছিল নাচোল পৌরসভার দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচন। সেদিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুর রশিদ খান ঝালুকে দ্বিতীয় পৌর পিতা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এ জয়ের মধ্য দিয়ে নাচোলের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান আগের চেয়ে আরো দৃঢ় এবং শক্তপোক্ত হলো। কেননা উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান— সবই আওয়ামী লীগের। এবার যুক্ত হলো পৌর মেয়র। নিঃসন্দেহে আগামী দিনের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ আরো বেশি মাত্রায় সক্রিয় এবং তৎপর হবে।
নাচোলের আওয়ামী রাজনীতি নিয়ে এর আগেও চাঁপাই চিত্রে লিখেছি। এবার আবার লিখতে বসেছি বিশেষ একটি কারণে। সেটি পরে বলছি। তার আগে নাচোল পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী জয়লাভ সম্পর্কে দুয়েকটি কথা বলা দরকার। এর আগে এখানকার আওয়ামী রাজনীতির অবস্থা কিরূপ বা কোন অবস্থায় ছিল তা বলাটা একটু কঠিন। সেটা না থাকার কারণেই। তবে এবার পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে যা দেখা গেল, তাতে নাচোল আওয়ামী লীগ ১০০ তে ১০০ পাবে। কেননা স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভোটে মেয়র প্রার্থী অন্যজন মনোনীত হওয়া এবং তা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে আবদুর রশিদ খান ঝালুর প্রার্থী হওয়ায় যারা ভেবেছিলেন দলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আরো চাঙ্গা হবে, তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। কেননা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় যেভাবে নেতাকর্মীদের কোলাহলে পরিপূর্ণ ছিল তা অতীতে এভাবে দেখা গেছে কিনা সে প্রশ্ন করাই যেতে পারে। তাছাড়া গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ভুলে দলীয় প্রার্থী আবদুর রশিদ খানু ঝালুর পক্ষে নেতাকর্মীরা যেভাবে কোমর বেঁধে নেমেছিলেন তাতে জয় তাদের প্রাপ্য। এটা সত্য যে, এবারের পৌর নির্বাচনে শুরু থেকেই নৌকার জয়লাভের বিষয়টি মানুষের মুখে মুখেও ছিল।
পৌরসভা নির্বাচনের আগেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত ছিল নাচোল আওয়ামী লীগ। একদিকে ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু বাক্কার সিদ্দিক (বর্তমানে মৃত), পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রশিদ খান ঝালু ও সাধারণ সম্পাদক আনারুল ইসলাম ঝাইটন। যারা সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। অন্যদিকে ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল কাদের এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান। শোনা যায়, এরা মঈনুদ্দিন মণ্ডল ও সংসদ সদস্য আবদুল ওদুদ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এ লবির জোরেই এবার পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরিবর্তিত হয়ে আবদুর রশিদ খান ঝালু মনোনয়ন পেয়েছেন— এ কথাও এলাকায় বেশ প্রচারে ছিল। তবে এটাকে মোটেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কেননা আওয়ামী লীগ দলীয় অফিসে আবদুল কাদের, মজিবুর রহমান এবং সর্বশেষ সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউর রহমানের উপস্থিতি একদিকে দলের মনোবলকে যেমন চাঙ্গা করেছে তেমনি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ভুলে তারাও এক হয়েছে সেটিও স্পষ্ট হয়। এখন হয়তো দেখার বিষয় বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফার নাচোলে উপস্থিতি কীভাবে হয়? যদিও তিনি এ মুহূর্তে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আছেন এ জন্য যে, রহনপুর পৌরসভা নির্বাচনে ছোটভাইকে মনোনয়ন দেয়ার পরও জেতাতে পারেননি বলে। তবে কী হয়, তা দেখার জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এবার আসছি শিরোনামের প্রসঙ্গে। নাচোল উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভা এখন আওয়ামী লীগের দখলে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত চারজন শক্তিশালী প্রতিনিধিই আওয়ামী লীগের। তাহলে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য কি নাচোল থেকে হতে পারে না? অবশ্যই পারে, যদি দল চায়। আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে কায়মনোবাক্যে সে আশাটাই করবো। কারণ, এর আগে নাচোলের মাওলানা মীম ওবায়দুল্লাহ এ আসনে (নাচোল-গোমস্তাপুর-ভোলাহাট) সংসদ সদস্য হয়েছেন। তাছাড়া আর কেউই এ উপজেলা থেকে সংসদ সদস্য হননি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন গোমস্তাপুরের সম্ভবত খালেক আলী মিয়া। বিএনপি থেকে প্রয়াত সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন ভোলহাট থেকে। আওয়ামী লীগ থেকে জিয়াউর রহমান ও গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস। দুজনেই গোমস্তাপুরের। ২০০৯ সালের নির্বাচনে অবশ্য বিএনপি থেকে নাচোলের প্রার্থী হয়েছিলেন আলহাজ আমিনুল ইসলাম, যিনি বছরের পুরোটা সময়ই নাচোলের বাইরে থাকেন। কাজেই পুরো নাচোলের নাগরিক হিসেবে বড় দুই দলের ব্যানারে কেউই সংসদ সদস্য নির্বাচন করার সুযোগ পাননি।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাচোল থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনীত করা হোক— উপজেলার পর পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর এ দাবি তুললে নিশ্চয়ই দোষের হবে না। এবং এ দাবিটিই এখন থেকে সরব হোক। নাচোলবাসী হিসেবে এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। আাশা করি জেলার নেতৃবৃন্দও বিষয়টি এবারের মতো ভেবে দেখবেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সংসদ সদস্য প্রার্থী কাকে করা যেতে পারে? ওঠা স্বাভাবিক। কে গ্রহণযোগ্য, কে ভালো হবে— এটা একেকজনের কাছে একেকজন হতে পারেন। তবে এ মুহূর্তে যদি কারো নাম বলতেই হয় তাহলে বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও নাচোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদেরের নামটাই সর্বাগ্রে আসবে। আশা করি, অনেকেই এর সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন। শিক্ষিত, রুচিশীল, মিডিয়াবান্ধব আবদুল কাদেরের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে বৈকি। তাছাড়া যে কথাটা না উল্লেখ করলেই নয় তাহলো, এবারের পৌরসভা নির্বাচনে আবদুর রশিদ খান ঝালুর জয়লাভের পেছনে তারও বড় ভূমিকা আছে। এ কথা জয়ী প্রার্থীও স্বীকার করবেন।
বলতে বাধা নেই, হোক না আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য। যদি হয়, সেটা নাচোল তথা নাচোলবাসীর জন্যই লাভ। কেননা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলেও নাচোল বরাবরই উন্নয়ন বঞ্চিত শুধু এখানকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হওয়ায় বা না থাকায়। আর কিছু না হোক, নিজেদের সংসদ সদস্য হলে জোর গতিতে এলাকার উন্নয়ন তো ঘটবে। সে জায়গা থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে নাচোল থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হোক, এ দাবি করা যেতেই পারে। বিএনপি হয়তো আবারও আলহাজ আমিনুল ইসলামকে দেবে। সেক্ষেত্রে জয়-পরাজয় এ উপজেলার মধ্যেই থাকবে।
আবদুল কাদেরের সঙ্গে খুব বেশি সখ্যতা নেই। যেটুকু দেখা বেশিভাগটাই দূর থেকে। তার বাচনভঙ্গি, চলাফেরা, সবকিছুই সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক। তবে সংসদ সদস্য নির্বাচন করতে হলে তাকে অবশ্যই এখন থেকে উঠেপড়ে লাগতে হবে। অন্য দুই উপজেলায়ও বেশি বেশি গণসংযোগ চালাতে হবে। সর্বপ্রথম বাকি দুই উপজেলায় নিজ দলের কর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। তারপর সাধারণ মানুষের কাছে যেতে হবে। জনপ্রিয়তা অর্জন কিংবা নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারলে মনোনয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র হয়তো আবদুল কাদেরকে নিরাশ নাও করতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন