মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১

দুই দলের দুই প্রস্তাব : গ্রহণযোগ্য কোনটি?

অষ্ট্রপ্রহর, ঢাকা; ২৬ অক্টোবর ২০১৩ 
[বণিক বার্তার সাপ্তাহিক আয়োজন]

২৫ অক্টোবর বা এর পর থেকে কী হবে— এমন শঙ্কা নিয়েই দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের বড় উত্সব দুর্গাপূজা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় তাদের আরেক বড় উত্সব ঈদুল আজহা উদযাপন করেছেন। শঙ্কার মধ্য দিয়েই আশার আলো দেখছিলেন ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ দেয়ার বিষয়টি জেনে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে দেশবাসীর শঙ্কা কতটুকু কেটেছে, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এরই মধ্যে জাতির উদ্দেশে দেয়া তার ভাষণের বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২১ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে হবে এ নিয়ে দেশের প্রধান দুই দল নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ভাষণ শুনে মনে হয়েছে, তিনি কিছুটা হলেও আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ভাষণে তিনি নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন। এজন্য বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার কাছে তার দলের সংসদ সদস্যদের নামও চেয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ২৫ অক্টোবর থেকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়ে দেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে আপাত আশ্বস্ত হওয়ার বিষয় এটুকুই। তবে ধোঁয়াশা সহসাই কেটে যাচ্ছে না। যদিও দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে গঠনমূলক উপাদান আছে, আলোচনার প্রস্তাব আছে এবং সর্বোপরি এ প্রস্তাব প্রধান বিরোধী দল বিএনপির গ্রহণ করা উচিত বলেছেন। কিন্তু যে ভাষণে সর্বদলীয় সরকারের প্রধান কে হবেন তা স্পষ্ট নয়, সে ভাষণকে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যইবা বলা যায় কীভাবে? বলা হচ্ছে, আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে সময়কে বিবেচনায় নিলে বলতে হয়, বর্তমানে আলোচনার সুযোগের চেয়ে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান জরুরি। কাজেই শেখ হাসিনা তার ভাষণে যদি সরকারপ্রধান কে হতে পারেন বা হবেন বা কীভাবে মনোনীত হবেন, সেটি খোলাসা করতেন, তবে একধরনের সমাধান হয়েই যেত। তিনি সেদিকে যাননি। বরং বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলেন, অবশ্যই কালক্ষেপণের মানসে।

ভাষণে স্পষ্ট সমাধান না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কেননা এবারের ভাষণে তিনি বিরোধী দলের প্রতি আক্রমণাত্মক কোনো বক্তব্য দেননি। অতীতে তিনি যা সচরাচর করতেন। অভিনন্দন জানাই, দেরিতে হলেও নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের কথা স্বীকার করা এবং বিরোধী দলকে আলোচনা করতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়ার জন্য। কেননা শেখ হাসিনা তার কঠোর মনোভাব বা অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও নমনীয় হয়েছেন এবং বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

তবে আওয়ামী লীগের কাছে সর্বোত্তম প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক ভাষণে ঘি ঢেলে দিয়েছেন তারই উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। ১৯ অক্টোবর বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, সর্বদলীয় সরকার হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন শেখ হাসিনা। তার এ বক্তব্য শেখ হাসিনার ভাষণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। প্রশ্ন ওঠে সরকার সত্যিকার অর্থে কতটুকু আন্তরিক, তা নিয়ে। আরেকটি ঘটনাও সরকারের সদিচ্ছা প্রশ্নে সংশয়ের সৃষ্টি করে। তা হলো, ২৫ অক্টোবর প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি সমাবেশকে ঘিরে ২০ অক্টোবর ভোর ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত রাজধানীতে সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন, লাঠি মিছিল ও অবস্থান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পুলিশ। ভাষণের পরদিনই এ ধরনের ঘোষণায় জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেসব বিশিষ্ট নাগরিক প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে স্বাগত জানিয়ে গঠনমূলক বলেছিলেন, তারাই আবার সরকারের এ সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

এদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ উপদেষ্টার মধ্য থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাঁচজন করে নাম প্রস্তাব করবে। এরাই নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আর সরকার ও বিরোধী দল মতৈক্যের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে খুঁজে বের করবে। প্রয়োজনে বর্তমান সংসদ ভেঙে যাওয়ার আগে তাদের নির্বাচিত করে আনা যেতে পারে।

খালেদা জিয়ার এ প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রস্তাবটি ভালো হলেও তা বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কারচুপির প্রশ্ন তুলেছিলেন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমানের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন নিয়েও অনুরূপ প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে বর্তমানে নির্বাচনকালীন সংকট উত্তরণের জন্য দুই নেত্রীর প্রস্তাব নিয়ে চলছে শোরগোল। কোনটি গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়। কোনটি ভালো প্রস্তাব, কোনটি মন্দ— এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে দুই নেত্রীর প্রস্তাব পর্যালোচনায় নিলে এগিয়ে রাখতে হবে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে। কেননা দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে দেশের সব মহলই গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা বলে আসছেন। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে সে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রস্তাব তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তিনি কে হবেন সরকারপ্রধান প্রশ্নে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেবেন। যদিও বিরোধী দলের প্রস্তাব বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ২৩ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিলেও কোনো কারণে তা স্থগিত করা হয়। হয়তো সময় নিচ্ছে ভেবে দেখার জন্য। কেননা মনে হয়েছে, বিএনপি নেত্রী এ রকম প্রস্তাব পেশ করতে পারেন, তা কারোরই বোধগম্য ছিল না। কমবেশ অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচনের দাবি তুলবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি প্রস্তাব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীন ছাড়া যেকোনো ফর্মুলায় নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি, যা আগে থেকেই তারা বলে আসছেন। এখন দুই দলের প্রস্তাব কোথায় গিয়ে ঠেকে, তাই দেখার জন্য দেশবাসীকে বসে থাকতে হবে।

বাঙালি মাত্রই আশাবাদী। আমাদের আশা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র আবারো বিকশিত হবে। ফিরে আসবে সুস্থ ধারার রাজনীতির চর্চা। প্রস্তাব ভালো না মন্দ, গ্রহণযোগ্য না অগ্রহণযোগ্য— এ বিতর্কের চেয়ে সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যে পৌঁছানো। ২০০৭ সালের পুনরাবৃত্তি আবারো এ দেশের রাজনীতিতে ঘটুক, তা দেশবাসীর কাম্য নয়। তবে আলোচনার স্বার্থে বলতে হয়, সরকারে যেহেতু আওয়ামী লীগ, সেহেতু ছাড় দেয়ার মানসিকতা তাদেরই আগে দেখাতে হবে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি নির্বাচন নিয়ে গোঁ ধরে থেকে যে ভুলের মাশুল হিসেবে ক্ষমতার মসনদ হারিয়েছিল, সে একই ভুল নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ করতে চাইবে না। সময় থাকতেই শুভ বুদ্ধির উদয় হবে— সবারই এ প্রত্যাশা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন