বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

খেলার মাঠগুলো কি খালিই পড়ে থাকবে?

দৈনিক চাঁপাই চিত্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১১ অক্টোবর ২০১৪


ঢাকায় দীর্ঘ সাংবাদিকতাজীবন শেষে চলতি বছরের মে মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছি। এই সময়ে জেলা ঘুরে উপরোক্ত শিরোনামে কিছু লিখব ভাবছিলাম; কিন্তু সময় কুলিয়ে ওঠা হয়নি। শুধু উপরোক্ত বিষয়ই নয়, এসব এলাকা ঘুরে মাথার মধ্যে বেশ কিছু বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে লেখার জন্য। সেসব নিয়ে আগামীতে পর্যায়ক্রমে লেখার আশা পোষণ করছি। পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, শুরুতে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরার জন্য। 

শিশু, কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীদের মেধার পাশাপাশি মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা কিংবা সংস্কৃতি কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চা অপরিহার্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজ অনেকাংশেই তা অনুপস্থিত। এই লেখায় শুধু খেলাধুলার ওপরই আলোচনা হবে। সংস্কৃতি বা সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে অন্য লেখায়। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে খেলাধুলার চর্চা আগের মতো নেই বলে মনে হয়। সেটি ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা আঞ্চলিক যেকোনো খেলাই হোক না কেন। যদিও এখন স্কুলপর্যায়ে খেলাধুলার আয়োজন হয়ে থাকে; কিন্তু তা কতটা ‘যথেষ্ট’, সে আলোচনা হতেই পারে। একটা সময় ছিল, যখন খেলার মাঠের অভাবে খেলোয়াড়দের চর্চা বন্ধ থাকত। কোনো খোলা জায়গা থাকলে, সেখানেই খেলাধুলা নিয়ে শিশু-কিশোর-তরুণরা ব্যস্ত থাকত। এখন সে দৃশ্য পাল্টেছে। অর্থাৎ খেলার মাঠ আছে, কিন্তু খেলোয়াড় নেই; খেলার চর্চাও নেই। তাহলে কী খেলাধুলা হারিয়ে যাবে? হয়তোবা? কিন্তু কেন এমনটি হচ্ছে? বর্তমানে খেলাধুলা করেও ভালো উপার্জন করা যাচ্ছে বা যায়। বরং যেকোনো খেলায় এখন পেশাদারিত্ব চলে এসেছে। রাজধানীর ক্লাবগুলোয় এক বছরের চুক্তিতে বেশ কয়েক লাখ টাকা পাওয়া যাচ্ছে, সেসব খবরও আমরা পত্রিকা মারফত জানতে পারছি। তাহলে? বরং বলা যায়, এখন আরো বেশি বেশি খেলার আয়োজন এবং নতুন নতুন খেলোয়াড় তৈরি হওয়ার কথা; কিন্তু তা হচ্ছে না। যেটুকু হচ্ছে তা বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) বদৌলতে। 

ভোলাহাট উপজেলা সদরে প্রায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে ৪টি খেলার মাঠ দেখেছি। ভোলাহাট মোহবুল্লাহ কলেজ, রামেশ্বর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, বজরাটেক ও উপজেলা পরিষদ চত্বরে খেলার মাঠ রয়েছে। গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর রেলস্টেশনের পাশে রহনপুর এবি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে তো একসময় টিকেট কেটে খেলা দেখতে হতো। দূর-দূরান্ত থেকে সবাই সেখানে যেত খেলা দেখতে। বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে ফুটবল খেলার আসর বসত। মনে আছে আমিও স্কুলজীবনে অন্যদের সঙ্গে নাচোল থেকে রহনপুর খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। রহনপুর ইউসুফ আলী ও গোমস্তাপুর কলেজেও রয়েছে মাঠ। এ বাদে রহনপুরের আর কোথায় মাঠ রয়েছে তা জানা নেই। রহনপুরের ক্রীড়াঙ্গনে এক নামে একজন ফুটবলারকে সবাই চিনত সে সময়। তিনি হলেন আতাউর। পৈত্রিক সূত্রে বাড়ি শিবগঞ্জে হলেও থাকতেন রহনপুরেই। আর ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে যে দুজন ব্যক্তিকে সবাই চিনতেন তারা হলেন রহনপুর ইউসুল আলী কলেজের শিক্ষক আফতাব উদ্দিন আহমেদ টিপু ও নুরুল আমিন। 

নাচোল উপজেলা সদরে দুই কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে চারটি মাঠ। এক সময় এসব মাঠ গমগম করত খেলোয়াড়দের পদচারণায়। কেউবা ফুটবল, কেউবা ক্রিকেট, কেউবা অন্য খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। এখন এ দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। এ অঞ্চলে হালআমলে ফুটবলের পা-গোল সংস্করণ জনপ্রিয় হয়েছে। মাঝেমধ্যে এ খেলার আয়োজন চোখে পড়ে। তবে সেটি টিকে থাকার মতো নয়, নিতান্তই শখের বসে। নাচোলেও বেশ কয়েকজন ফুটবলার ছিলেন, জেলাতে যাদের এক নামেই মানুষ চিনত। মনি (সম্ভবত সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন), লিটন, সাঈদ প্রমুখ। এদের মধ্যে সাঈদ গোলকিপার হিসেবে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে ঢাকায় ফুটবল লীগে খেলেছেন। সমধিক পরিচিতি পেয়েছিলেন লিটন। শরীরের গড়নটাও ছিল তাকে মনে রাখার মতো। শুনেছি বর্তমানে তিনি প্রবাসী। ক্রিকেটে মেরাজ খেলেছেন ঢাকা লীগে। নাচোলের খেলাধুলার চর্চাকে অনেকটা সময় পর্যন্ত যারা ধরে রেখেছিলেন, তারা হলেনÑ নাচোল গোডাউনপাড়ার রবিউল, আনিকুল, সুফল স্যার, স্টেশন এলাকার ব্রজেন, সুধা, মান্নান, মাস্টারপাড়ার নুরুল্লাহ, সুতা (ভালো নাম জানা নেই), থানাপাড়ার শরীফ প্রমুখ। আরো কয়েকজন ছিলেন, তাদের নাম এ মুহূর্তে মনে না আসার জন্য মার্জনা চাইছি। আর ক্রীড়ানুরাগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বিআরডিবি কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও আলাউদ্দিন আহমেদ বটু।

জনসংখ্যার বিচারে শিবগঞ্জ উপজেলা সদরে খেলার মাঠের অভাব ছিল, তা বলতেই হয়। শিবগঞ্জ সরকারি মডেল হাইস্কুলের ছোট্ট একটি মাঠ আর শিবগঞ্জে কলেজের সামনের মাঠ। বর্তমানে এটি স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে। পরিতাপের বিষয়, স্টেডিয়ামে পরিণত হওয়ার পর খেলাধুলা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে এ মাঠ থেকে। স্টেডিয়ামের বাইরের চিত্র দেখে তা অনুমান করতে বেগ পেতে হয় না। আর পদ্মা সিনেমা হলের পাশে একটি মাঠ ছিল, যেটিকে আবার পুরোপুরি খেলার মাঠ বললে ভুল হবে। কেননা এ মাঠে সপ্তাহের দুদিন হাট বসত। এখন সেটি আর নেই। পুরোটাই বাজার গড়ে উঠেছে। 

সদর উপজেলায় জেলা স্টেডিয়াম আর নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের মাঠ পাশাপাশি। একসময় বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ফুটবল খেলার আসর বসত জেলা স্টেডিয়ামে। বিকেএসপির ছেলেরাও এসেছিল এ মাঠে খেলতে। আমরা দলবেঁধে খেলা দেখতে গিয়েছি। সে সময় একজন ফুটবলারের নাম মনে আছে, ‘তোফা’। সবার কাছে তোফা ভাই নামে পরিচিত। যতদূর মনে পড়ে তোফা ভাইয়ের অবসর নেয়া উপলক্ষে আয়োজিত ফুটবল খেলাটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

এর বাইরেও প্রত্যেক উপজেলার প্রতিটি উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের (বিশেষ করে যেগুলো পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে খেলার মাঠ রয়েছে বলে ধারণা করি এবং থাকাটা খুবই স্বাভাবিক।

শিবগঞ্জ সরকারি মডেল হাই স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের ছোট্ট মাঠটি ছিল আমাদের একমাত্র জায়গা। এখানে অনুশীলন হতো ফটুবলের, ক্রিকেটের। শীতের সময় চলত ব্যাডমিন্টন খেলার ধুম। পাশাপাশি আঞ্চলিক খেলাগুলোর চর্চাও হতো। বিশেষ করে গাদ্দি (এর কোনো ভালো নাম আছে কি না, তা জানা নেই)। আর বাগানের ফাঁকা জায়গায় কিশোরীরা খেলত মানুষবুড়ি, গুঁটি। কেউবা মেঝেতে দাগ কেটে গুঁটি খেলত। ছেলেরা খেলত টিপ্পু। গ্রামের ভেতরে হাডুডু খেলাও হতো। গ্রাম ঘুরে আঞ্চলিক খেলাধুলায় শিশু-কিশোর-কিশোরীদের মত্ত থাকতে দেখা গেছে। এখন এসব খেলা শুধুই স্মৃতি। শিবগঞ্জের খেলাধুলার কথা বলতে গেলে যে নামটি বেশি মনে পড়ে, তিনি হলেন এমদাদ। ‘কালো মানিক’ বলে নিজেই নিজের খেতাব দিয়েছিলেন কোনো এক বছরের শুরুতে। কি ক্রিকেট, কি ফুটবল, কি দৌড় প্রতিযোগিতাÑ সব জায়গায় সমান পারদর্শী। বলতে গেলে তাদের পুরো পরিবারটিই ছিল খেলাধুলামনস্ক। আরেকটি পরিবার ছিল এরকম। ভাই থেকে শুরু করে বোনগুলো পর্যন্তও। তাদের একজন ছিলেন আজম। এখন বেঁচে নেই। তিনি এবং ‘বাঙ্গালী’ নামে আরেকজন ফুটবলার ঢাকা লীগে খেলে খেলেছেন। ক্রিকেটেও বেশ ক’জন জেলাতে খ্যাতি ছড়িয়েছিলেন। দুঃখিত তাদের নাম এখন মনে আসছে না বলে। 

কলেজজীবনে ক্রিকেট লীগ খেলতে গিয়েছি জেলা স্টেডিয়ামে। কয়েক বছর খেলেছিও। সময়টা ১৯৯৩-৯৭। এর এক বছর পর চলে যায় রাজধানী ঢাকায়। ঢাকায় থাকাকালীন এ অঞ্চলে খেলাধুলা কতটুকু হয়েছে তা জানা নেই। তবে এ কয়েক মাসে এটুকু অনুধাবন করতে পারছি যে, আজ খেলাধুলার চর্চা হারিয়ে যেতে বসেছে। অবশ্য এর বাইরে কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে খেলাধুলার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সেটা সামান্যই। মোদ্দা কথা, খেলাধুলার সময় কই?

অনেকেই হয়তো বলবেন, স্কুল-কলেজে পড়াশোনার চাপ বেড়ে গেছে। খেলাধুলার জন্য সময় বের করা শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন? কথাটা বিশ্বাস করি। কিন্তু যারা এ কথা বলছেন তারা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবেন যে, এখন একটা ছেলে সেলফোনে কিংবা ফেসবুকে কিংবা টেলিভিশন দেখতে কিংবা ‘অযাচিত’ আড্ডা দিতে যতটা সচ্ছন্দ বোধ করে, খেলাধুলায় তার সিঁকিভাগও মনোযোগ দিতে চায় না। স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের অযাচিত আড্ডার হার অনেকাংশে বেড়ে গেছে। সম্মান দিতে ভুলে গেছে। মানবিক মূল্যবোধ হারিয়েছে। মাদকে আসক্ত হচ্ছে অনেকেই। এসবের জন্য অভিভাবকরাই দায়ী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। কেননা খেলাধুলাতে আগ্রহী করে তুলতে হবে অভিভাবককেই। পড়াশোনার পাশাপাশি অবশ্যই খেলাধুলার প্রয়োজন রয়েছে। শারীরিক কিংবা মানসিক গঠনÑ উভয়ের জন্যই। আমি কেন, আরো অনেকেই বিশ্বাস করবেন যেÑ শিশু-কিশোর-তরুণরা যদি খেলাধুলা-সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকে তাহলে তাদের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আজ এসব চর্চার অভাবেই তরুণ সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। স্কুলজীবন থেকেই জড়িয়ে পড়ছে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে, যার পরিণতি আজকের সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে ভালোই বোঝা যায়। সময় ফুরিয়ে যায়নি, শেষও হয়ে যায়নি। সময় মানুষকে তৈরি করে না। সময় তার নিজস্ব নিয়মে চলমান। শুধু মানুষ তাদের নিজের মতো সময়কে তৈরি করে সামনে এগিয়ে যায়। দায় চাপায় সময়ের ওপর। আর তাই তো বর্তমানে অনিয়ম, দুর্নীতি, খুষ খাওয়া নিয়মে পরিণত হয়েছে সময়ের দোহাই দিয়ে। কিন্তু এর বিরূপ প্রভাবও সন্তানের ওপর পড়েÑ এ সত্যটা কি সেসব অভিভাবক বুঝতে পারেন?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন